শৈশব স্মৃতি: ৯০-এর দশকের পল্লী গ্রামের রান্না জীবন আমার শৈশবের স্মৃতিতে গ্রামীণ রান্নাঘরের দৃশ্য আজও স্পষ্ট। ৯০-এর দশকে আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা আধুনিক হিটার ছিল না। রান্না-বান্না সম্পূর্ণ নির্ভর করত প্রকৃতির দেওয়া উপকরণের উপর। প্রতিটি পরিবারই নিজেদের জমি, ক্ষেত আর গৃহপালিত পশু থেকে রান্নার সামগ্রী সংগ্রহ করত। 🔥 রান্নার জ্বালানি ধান কাটার পর পাওয়া খড়, লম্বা জাতের ধানের শুকনো ঘর, পাট খড়ি, ধৈঞ্চার ডাঁটা, গরুর গোবর শুকিয়ে তৈরি উপলা—সবই রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। শিমুল তুলার শুকনো ফুল কিংবা বাঁশের পাতা পর্যন্ত কাজে লাগত। প্রতিদিন সকালে মহিলারা উঠোনে এগুলো বিছিয়ে সূর্যের আলোতে শুকাতেন। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টির কারণে শুকনো জ্বালানি পাওয়া কঠিন হতো, তখন প্রবীণরা বলতেন: “সূর্য থাকতে থাকতেই ঘর শুকিয়ে নাও।” 🍲 রান্নার পাত্র ও চুলা রান্নার হাঁড়ি-পাতিল ছিল মাটির তৈরি। ধনী পরিবারে পিতলের থালা-বাটি দেখা যেত। চুলা ছিল কাদামাটি দিয়ে গড়া বা তিনটি পাথর সাজিয়ে বানানো। রান্নার সময় ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে যেত, চোখ জ্বালা করত, কিন্তু সেটাই ছিল স্বাভাবিক। 👩🌾 মহিলাদের রান্না জীবন গ্রামের মহিলাদের দিন শুরু হতো রান্নাঘরেই। ভোরে উঠেই তারা খড়কুটো, উপলা বা পাট খড়ি দিয়ে চুলা জ্বালাতেন। আগুন ভালোভাবে না জ্বললে বাঁশের সরু চোঙ্গা দিয়ে ফু দিতেন, আর বারবার ধানের তুষ ছিটিয়ে আগুন জ্বালাতেন। রান্নার সময় তারা শুধু খাবার তৈরি করতেন না, বরং পরিবারের জন্য ভালোবাসা আর যত্ন ঢেলে দিতেন। বর্ষাকালে রান্না ছিল সবচেয়ে কষ্টকর। ভেজা খড়ে আগুন ধরত না, ধোঁয়ায় রান্নাঘর ভরে যেত। তখন প্রতিবেশীর কাছ থেকে আগুন নিয়ে আসা ছিল সাধারণ অভ্যাস। কেউ রান্নার আগুন জ্বালালে অন্যরা পাট কাঠি হাতে সেখানে যেতেন, আগুন নিয়ে এসে নিজেদের চুলায় রান্না শুরু করতেন। এটি ছিল সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক। 🌿 খাবারের উপকরণ শাকসবজি, ডাল, মরিচ, হলুদ, আদা, রসুন—সবই জমি বা আঙিনা থেকে পাওয়া যেত। মাছ ধরা হতো পুকুর, খাল বা নদী থেকে। দুধ, মাংস আসত গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি থেকে। সরিষা ঘানিতে পিষে তেল তৈরি করা হতো। কোনো কিছু কিনে আনার প্রয়োজন ছিল না। 🏡 স্মৃতির আবেশ শৈশবে আমি দেখতাম, রান্নাঘর শুধু খাবার তৈরির স্থান নয়, বরং পরিবারের মিলনস্থল। মা রান্না করতেন, আমরা পাশে বসে গল্প করতাম। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করলেও সেই রান্নার গন্ধ আজও মনে আছে। ভাতের হাঁড়ি থেকে উঠা বাষ্প, শাকের ঝোলের গন্ধ, মাছ ভাজার শব্দ—সবই আমার শৈশবের অমূল্য স্মৃতি। --- ✨ উপসংহার ৯০-এর দশকের পল্লী গ্রামের রান্না জীবন ছিল প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের প্রতিফলন। মহিলাদের পরিশ্রম, ধৈর্য আর দক্ষতা সেই রান্নাঘরকে জীবন্ত করে তুলত। আজকের আধুনিক প্রযুক্তি হয়তো রান্নাকে সহজ করেছে, কিন্তু সেই ধোঁয়ায় ভরা রান্নাঘরের স্মৃতি, সহযোগিতার আগুন ভাগাভাগি আর প্রকৃতির উপহার দিয়ে তৈরি খাবারের স্বাদ—আমার শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

mohammod maminul Islam
Elahabad
public1 media

ট্যাগ90s