দাগ দেখেও বয়স অনুমান করা যায়।তখন সকল গিরস্তের গরু রাখার ঘর ছিল। তাই সবাই একদিন একদিন পরে পালাক্রমে কুরবানির গরুটিকে নিয়ে রাখতো। তবে যার ঘরেই গরু থাকুক না কেন আমরা ছোটরা সবসময় সেই গরুর জন্য কচি ঘাস,ভাতের মাড় ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতাম। তখন গরু মোটা তাজাকরণের কোন মেডিসিন ছিল না । আমরা ধান থেকে প্রাপ্ত কুড়া, সরিষা থেকে খৈল, গুড় থেকে প্রাপ্ত রাব খাইয়ে গড়ুর যত্ন নিতাম। কে কত বড় কুরবানি দিতে পারে সে প্রতিযোগিতা তখনও কম- বেশি ছিল। ঈদের ১৫ দিন আগে আমরা গ্রামের অলি গলি ঘুরে দেখা শুরু করতাম। কে কত বড় গরু এনেছে এবং কোন গরুর রং কি রকম। কোনটি বেশি দুষ্ট তা আমাদের নখ দর্পণে থাকতো। একবার আমাদের বাড়ির উত্তর দিকের মুন্সি বাড়িতে আঠারো হাজার টাকা দিয়ে কালো রঙের একটি ষাড় গরু কেনা হয়েছিল। সে কি বিশাল গরু! আমরা ভয়ে তার কাছে যেতাম না, দূর থেকে গাছের পাতা ছুড়ে মারতাম। সেটি খেয়ে গরুটি আমাদের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকতো, মনে হতো সে যেন আল্লাহর কাছে দোয়া করছে। বিশাল গরুটি দেখার জন্য কয়েক গ্রামের লোক এসে ভিড় করেছিল। আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ আসে ১৯৮৩ সালে । তবে সে সময় গ্রামের কারো ঘরে ফ্রিজ ছিল না। তাই বড় গরু কিনে তা ফিজে রাখার রেওয়াজ তখনও চালু হয়নি। যারা বড় গরু কোরবানি দিতেন তারা অতিরিক্ত মাংস গরীব- মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। তখন শুনতাম তিনদিনের বেশি কুরবানির গোশত জমা করে রাখা যায় না। আমাদের গ্রামে ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুজাফফর আহমদের বাড়ি। তিনি কুড়ের ঘর মার্কা নিয়ে রাজনীতি করতেন। লাল রঙের একটি বিশাল বড় গরু মোজাফ্ফরের মাঠে বাঁধা বাঁশের খুঁটিতে আটকে রাখতে দেখতাম। কুরবানির পর দিন সকালে লাল টুপি মাথায় দিয়ে ন্যাপের কর্মীরা সেটি কুরবানি করেগরিব নেতা কর্মীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। নামাজ শেষে দ্রুত বাড়ি আসতাম। কার গরু কখন জবাই হয় সেই খবর নিয়ে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখতাম।কোনটি স¦াভাবিকভাবে আমার দাদা জবাই করলেন আর কোনটি জবাইয়ের সময় উঠে দৌড় দিল, তারপর আবার সবাই রক্তমাখা গরুটিকে ধরে এনে পুনরায় শুইয়ে দিল তা খেয়াল রাখতাম।অন্যদের গরু জবাইয়ের দৃশ্য দেখা শেষ হওয়ার পর হঠাৎ মনে হতো ঢোল বানানোর কথা। আর তো ঘুরাঘুরি করা যায় না । দৌড়ে আসতাম আমাদের গরুর কাছে। এতক্ষণে গরুর কাজ অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। অপেক্ষায় থাকতাম কখন গরুর পেট থেকে বের করা হবে চর্বি জাতীয় এক ধরনের সাদা পর্দা। বড় ভাই সেগুলো আমাদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। আমরা সেগুলো ভাঙা কলসের মুখে লাগিয়ে টিনের চালে শুকাতে দিতাম। কলসের খুলি ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখতাম। বিকেল হলেই কচুর চিকন ডগা দিয়ে বাজানো শুরু করতাম ঢোল। ডুম-ডুম আওয়াজে মাতিয়ে তুলতাম সব বাড়ি। একসময় কারটা কত বেশি বাজানো যায় সে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সেটি ফেটে গেলে কান্না-কাটি করতাম। বাড়িতে যাতে প্রেতাত্মা না ঢুকে সেজন্য গরুর শিংগুলো দরজার পাশে, লাউ ক্ষেতে যাতে কারো নজর না লাগে সেজন্য গরুর দুপাটি দাঁত লাউয়ের মাচার নিচে ঝুলিয়ে রাখতাম।। মধুর আনন্দঘন সেই দিনগুলো ঢোলের আওয়াজের মতো হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। খুব মিস করি সেই দিনগুলোকে। খু–উ–ব। খুব বেশি। লেখক পরিচিতিঃ সাংবাদিক, ঐতিহ্য গবেষক ও মুরাদনগর , সামছুল হক কলেজের সিনিয়র প্রভাষক।

mohammod maminul Islam
Elahabad
publicText only